ভুলে ডাকাতের বাসে চড়ে প্রাণটাই দিলেন রবিউল

by | ফেব্রু ২৯, ২০২৪ | অপরাধ | ০ comments

যাত্রীবাহী বাস ভেবে সাভারের নবীনগর থেকে রাতে বাসে উঠেছিলেন ব্যবসায়ী লস্কার রবিউল ইসলাম। গন্তব্য ঢাকার গাবতলী। ওঠার কিছুক্ষণ পরই টের পান বাসের সবাই ডাকাত দলের সদস্য। তাঁর কাছ থেকে টাকা-পয়সা লুট করার চেষ্টা করে তারা। এতে বাধা দেন তিনি। এক পর্যায়ে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে বাসের মধ্যে ফেলে দেয়। এরপর বুকের ওপর বসে মুখে টুকরো কাপড় ঢুকিয়ে ও গলাটিপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাঁকে। ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর রাতে এ ঘটনা ঘটে। 

রবিউল হত্যা মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সম্প্রতি ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। পিবিআই বলছে, আসামিরা ভাড়া করা বাস নিয়ে ঢাকা, টঙ্গী ও মানিকগঞ্জ এলাকায় ডাকাতি করে। রবিউলকে হত্যার দিনও ডাকাতিতে নেমেছিল তারা। ডাকাতিতে বাধা পেয়ে রবিউলকে হত্যা করা হয়। 

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে রবিউল ইসলামের হোটেল ব্যবসা ছিল। তাঁর বাড়ি নড়াইলের নড়াগাতী এলাকায়। তবে পরিবার নিয়ে থাকতেন মিরপুরে। ঘটনার দিন বিকেলে তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আশুলিয়া থানাধীন জামগড়ায় যান দুই ভাগনের সঙ্গে দেখা করতে। এরপর সেখান থেকে রিকশায় করে যান আশুলিয়া ইপিজেড এলাকায়। পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা করে বের হন রবিউল। সন্ধ্যা ৭টার দিকে মেয়ে হাবিবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। বাসায় ফিরছেন বলে মেয়েকে জানান তিনি। এটিই ছিল পরিবারের কারও সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। 

ডাকাতরা ভাড়ায় বাস নিয়ে যাত্রী তুলে ডাকাতি করছিল ওই রাতে। রাত ৮টার দিকে সাভার থানাধীন নবীনগরে রাস্তার পাশে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন রবিউল ইসলাম। একটি বাস থামলে তিনি সরল মনে গাবতলীর উদ্দেশে ওঠেন। বাসটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছলে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর কাছে থাকা টাকা-পয়সা ও মোবাইল ফোন দিয়ে দিতে বলে ডাকাতরা। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ডাকাত সদস্যরা তাঁকে মারধর শুরু করে।

বাসের ভেতর ফেলে তাঁর বুকের ওপর বসে হাত-পা চেপে ধরে কিল-ঘুসি মারতে থাকে। এই অবস্থায় এ ব্যবসায়ী তাদের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলে গাড়িতে থাকা হুইল রেঞ্জ (গাড়ির চাকা খোলার যন্ত্র) দিয়ে তাঁকে আঘাত করে এক ডাকাত। এক পর্যায়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর ডাকাত সদস্যরা রবিউলের মুখের মধ্যে টুকরো কাপড় ঢুকিয়ে দেয় এবং গামছা দিয়ে রবিউলের মুখ বেঁধে ও গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে মৃতদেহ আমিনবাজার এলাকার একটি ঝোপের মধ্যে ফেলে চলে যায় তারা। এরপর রবিউলের ফোন থেকে তাঁর মায়ের ফোনে কল করে ডাকাত নেতা বশির। ছেলের ফোন পেয়ে অপরপ্রান্ত থেকে মা রেখা বেগম বলেন, ‘রবিউল তুই কই?’ কিন্তু ছেলের কাছ থেকে কোনো জবাব পাননি তিনি। জবাবে বশির বলে, রবিউল মারা গেছে। লাশ হেমায়েতপুরে রাখা হবে। এই বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। 

পর দিন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যার ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মোসা. হাফিজা বাদী হয়ে সাভার থানায় মামলা করেন। অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়। প্রথমে সাভার থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়। পরে এ মামলার তদন্ত শুরু করেন এসআই সালেহ ইমরান। তদন্তে রবিউল হত্যায় ১৬ জনের জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পান। তাদের অভিযুক্ত করে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতে চার্জশিট জমা দেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, রবিউল হত্যায় জড়িতরা ডাকাত দলের সদস্য। তারা ভাড়া করা বাস নিয়ে যাত্রীদের কাছে ডাকাতি করত। 

রবিউল হত্যায় অভিযুক্তদের মধ্যে বশির মোল্লা ডাকাতদের দলনেতা। তার বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকী থানার আঙ্গারিয়া গ্রামে। জড়িত অপর ১৫ জন হলো– টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের নাজমুল হাসান মণ্ডল, ফরিদপুরের ভাঙ্গার হাফিজ শেখ, মানিকগঞ্জের আসলাম ও টিটু মিয়া, আশুলিয়ার জুয়েল, ধামরাইয়ের আল আমিন ও আমির হোসেন, কেরানীগঞ্জের জসিম মিয়া, বাগেরহাটের মোংলার আল আমিন, নোয়াখালী সেনবাগের নাঈম হোসেন, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের তপন, লক্ষ্মীপুরের আজাদ হোসেন জাবেদ, ডেমরার আব্দুর রহিম, মুন্সীগঞ্জ টঙ্গীবাড়ীর আনোয়ার হোসেন এবং নড়াইলের মনির হোসেন। তাদের মধ্যে মনির হোসেন বাদে বাকি ১৫ জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়। এখন তাদের কেউ কেউ জামিনে ও কারাগারে।

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *