খলিলুর রহমান খলিল ‘কানাডা প্রবাসী’ পরিচয়ে ডা. লতা আক্তারের মনে বিচরণ শুরু করে। চিকিৎসক লতা ছিলেন পুরোটাই অন্ধকারে। ঠকবাজির কথা জানতেন না ঘুণাক্ষরে। এক পর্যায়ে দু’জনের প্রেমের সেতু! বছর দুয়েক আগে বাঁধেন গাঁটছড়া। খলিলের ছাইচাপা দেওয়া পরিচয় ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। ডা. লতা যখন জানতে পারেন স্বামী খলিল গাড়িচালক, তখন তাঁর কিছুই করার ছিল না একমাত্র বিচ্ছেদ ছাড়া। সেই পথেই হেঁটেছেন লতা। তাতে আরও ‘হিংস্র’ গাড়িচালক খলিল।
নরসিংদীর রায়পুরায় গত রোববার বিয়ে বিচ্ছেদ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা ও মনোমালিন্যের এক পর্যায়ে লতার শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় খলিল। গুরুতর দগ্ধ লতা এখন ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন। ওই ঘটনায় খলিলও দগ্ধ হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসায় অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গতকাল সোমবার তাকে ঢাকায় আনা হয়। সেও শঙ্কামুক্ত নয়।
গতকাল সোমবার দুপুরে বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউর সামনে ডা. লতার খালু ফরহাদ চৌধুরীর বিমর্ষ মুখ। মেধাবী মেয়েটির এমন পরিণতি তিনি কোনোভাবেই মানতে পারছেন না। তিনি বলেন, লতা রাজধানীর গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে। নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সপ্তাহে তিন-চার দিন রোগী দেখে। সেই সঙ্গে উচ্চতর পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে লতা সবার ছোট। দুই ভাইবোন ইতালি থাকে। তার বাবা মফিজুর রহমান আগেই মারা গেছেন। মা বিলকিস বেগমের সঙ্গে রায়পুরার মরজাল ইউনিয়নের ব্রাহ্মণেরটেক গ্রামের বাসায় থাকত লতা। রোববার দুপুর ১২টার দিকে সে নিজ ঘরে পড়ালেখা করছিল। তখন খলিল হঠাৎ এসে তার ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। সেখানেই আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে তাদের আর্তচিৎকারে সবাই ছুটে গিয়ে দু’জনকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাদের নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রোববার বিকেলে লতাকে ঢাকায় আনা হয়।
স্বজনরা জানান, লতাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে শুরু থেকেই মিথ্যাচার করে আসছিল খলিল। সে বলেছে, তার পরিবারের সবাই কানাডা থাকে। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। অথচ তার বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রি; দেশেই থাকে। তার ভাইও শ্রমজীবী। খলিল আগেও বিয়ে করেছে। সেই স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক টেকেনি। ওই স্ত্রী তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। এ জন্য নিয়মিত তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। এসব তথ্য বিয়ের আগে জানতে পারেননি লতা। বিয়ের পর জানতে পেরে তিনি মর্মাহত। তিনি স্বামীকে বলেন, ‘তুমি গরিব হলেও তো আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু মিথ্যা কেন বললে? কেন প্রতারণার আশ্রয় নিলে?’ এ পরিস্থিতিতে খলিল নানা রকম ব্যাখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও কাজ হয়নি। দু’জনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তিন মাস আগে স্বামীকে তালাক দেন লতা। তখন থেকেই খলিল তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। এর মধ্যে রোববার দুপুরে লতার বাসায় যায় খলিল। তার বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ার বেলাশী এলাকায়। বাবার নাম আতর আলী।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তরিকুল ইসলাম জানান, ডা. লতাকে সারিয়ে তুলতে সব রকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
এদিকে খলিলের ভাই মফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, লতাকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ সঠিক নয়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে খলিল ও লতা দু’জনই নিজেদের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়।’
নরসিংদী প্রতিনিধি নুরুল ইসলাম জানান, মিথ্যা পরিচয়ে বিয়ে করায় দু’জনের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে ঝামেলা চলছিল। ঘটনাটি মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে সালিশ হলেও সুরাহা হয়নি। এত কিছুর পরও মীমাংসার কথা বলে রোববার লতার বাড়িতে যায় খলিল।
রায়পুরা থানার ওসি সাফায়েত হোসেন পলাশ জানান, রোববার খলিল ও লতা দু’জন একই ঘরে ছিল। তখন কে কাকে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়েছে– জানা যায়নি। ওই ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগও করেনি।

০ Comments