বই আলোচনা লেতা সেমোয়া : আমিই রাষ্ট্র

by | ফেব্রু ২৯, ২০২৪ | কালের খেয়া | ০ comments

ফরাসি সম্রাট লুই ক্যাতরজের উক্তি থেকে বইটির নাম। প্রধানমন্ত্রী কার্দিনাল মাঝারিনের মৃত্যুর পর চতুর্দশ লুই ঠিক করেন তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী নেবেন না। নিজেই চালাবেন দেশ। তিনি বলেন, লেতা সেমোয়া। আমিই রাষ্ট্র। ফরাসি দেশের ভ্রমণকাহিনি হলেও উপন্যাসের মতো বইটির প্রধান চরিত্র চতুর্দশ লুই। ইতিহাসের অপমূল্যায়িত চরিত্র ফরাসি রানী মারি অঁতোয়ানেত এসেছেন– যিনি কখনোই বলেননি, ওরা কেন পোলাও খায় না। লেখক অষ্টাদশ শতকে নারীর অবস্থান তুলে ধরেছেন। সে সময়ের চিত্রশিল্পী এলিজাবেথ ভিজে লোবখাঁ এসেছেন। বইতে দিয়েছেন এলিজাবেথের আঁকা টিপু সুলতানের রাজপ্রতিনিধির প্রতিকৃতি। ফ্যাশন ডিজাইনার রোজ বেখতাঁর গল্প এসেছে। ফরাসি বিপ্লবের পরে কীভাবে এদের জীবন পাল্টে গেল। ভের্সাই প্রাসাদে মারি অঁতোয়ানেতের কক্ষগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক ইতিহাসের বাঁকগুলো ছুঁয়ে গিয়েছেন। 

ফরাসি দেশের ভ্রমণকাহিনি মানে আইফেল টাওয়ারের বর্ণনা। লেখক ফরাসি বাগানের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। এসেছে ভূদৃশ্য স্থপতির অঁদ্রে লোনতের কথা। চতুর্দশ লুইয়ের সাথে সমান্তরাল করেছেন অঁদ্রে লোনতের জীবন। বইতে প্রতিটি শিল্পকর্ম বর্ণনা করতে গিয়ে শিল্পীর কথা লিখেছেন লেখক। নেপথ্যের কুশীলবরা এসেছেন। ফরাসি খাবার এবং শেফ এসেছে। ফরাসি পোশাক এবং ফ্যাশন। চতুর্দশ লুই এবং মারি অঁতোয়ানেত কীভাবে সে সময়ের এবং বর্তমানের ফ্যাশন ডিজাইন প্রভাবিত করছেন, সেসব আলোচনা করেছেন। বইটির মূল প্রাণ লেখকের নিজের তোলা বিরল সব আলোকচিত্র। ভের্সাই বাগান চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। কীভাবে অঁদ্রে লোনতের হাতে ফরাসি বাগানের জন্ম হয়, তা বর্ণনা করেছেন। ইতালিয়ান রেনেসাঁ স্থাপত্যের পাশে কীভাবে ফরাসি স্থাপত্যের জন্ম হয়? ফরাসি স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য কী? বারোক স্থাপত্য কী? কেন ভ্যাটিকানে বারোক স্থাপত্যের জন্ম হয়? ক্যাথলিক ধর্মমতের ওপর আক্রমণ এবং বাঁচার উপায় হিসেবে পোপতন্ত্র কীভাবে বারোক শিল্পরীতির জন্ম দেন। বারোক রীতি চিত্রশিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, পোশাক থেকে সাহিত্য পর্যন্ত বিস্তৃত। আন্তোনিও গ্রামশি জানতে চেয়েছিলেন, কেন দক্ষিণ ইতালির প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টি? দক্ষিণ ইতালির মানুষ জান লোরেন্সো বের্নিনি ফরাসি ভ্রমণকাহিনিতে ঢুকে পড়েন। লেখক বইতে দিয়েছেন বের্নিনির তৈরি চতুর্দশ লুইয়ের আবক্ষ মার্বেলমূর্তি। কৌতুক করে লিখেছেন, 

“তার জন্ম নেপলস। নেপলস থেকে আসত চোর-ডাকাত, মাফিয়া। বের্নিনি বলতেন, আমরা ফ্লোরেন্সের মানুষ।” 

বই লিখতে গিয়ে, লেখকের কলম সম্ভবত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। সেজন্য রোমে গিয়ে কী দেখবেন বিস্তৃত লিখেছেন। ফ্লোরেন্সে কী আছে? লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অমর শিল্পকর্ম মোনালিসা বলতে গিয়ে ফ্লোরেন্সে চলে গিয়েছেন লেখক। ফ্লোরেন্সের মানীগুণী লোকদের কথা বলে ভিঞ্চির কাহিনি শুরু করেছেন। শুরু করেছেন দান্তে দিয়ে। মোনালিসার গল্প গিয়ে ঠেকে ভিঞ্চির জীবনীতে। ভিঞ্চির প্রায় সব চিত্রকর্মের ছবি এবং বর্ণনা আছে। লেখক ভিঞ্চির ছবি তুলতে মিউনিখ গিয়েছেন। যেতে পারেননি পোল্যান্ড। সেখানেও ভিঞ্চির ছবি আছে। 

লুভর মিউজিয়ামের মিসর অধ্যায় বলতে গিয়ে চলে গিয়েছেন মিসর। অধ্যায়ের নাম, ‘মিসরের নেপোলিয়ন’। নেপোলিয়নের মিসর না লিখে লিখেছেন, মিসরের নেপোলিয়ন। একইভাবে লিখেছেন, ‘ইফেলের প্যারিস টাওয়ার’। হতে পারত এই অধ্যায়ের নাম প্যারিসের আইফেল টাওয়ার। নেপোলিয়ন মিসর আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। আলেকজান্ডার মিসর জয় করেননি। তিনি মিসরের মানুষের মন জয় করেছেন। বিনা রক্তপাতে মিসর নিয়েছেন তিনি। আলেকজান্ডারের সময় মিসরে হাইরোগ্লিফ পড়তে এবং লিখতে পারে, এমন মানুষ বেঁচে আছে। নেপোলিয়নের সময় তারা বিলুপ্ত। জাহাজে বসে নেপোলিয়ন মিসর সভ্যতা নিয়ে পড়েছেন। পড়েছেন কোরআন শরিফ। আরবি শিখতে পারেননি। সাথে রাখতেন দোভাষী। লেখক নেপোলিয়নের অভিষেক ছবিতে দোভাষী রাফায়েল দো মোনাশির ছবি তীর দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। লেখকের স্বভাব ডিটেইলে যাওয়া। ইতিহাসের উপেক্ষিত চরিত্রগুলোর দিকে তাঁর মনোযোগ।

নেপোলিয়নের সময় হাইরোগ্লিফ মৃত ভাষা। তাঁর মিসর অভিযানে রোজেটা পাথর আবিষ্কার হয়। ফরাসি বহুভাষাবিদ জঁ ফ্রঁসোয়া শাপোলিওঁ হাইরোগ্লিফ লিপির পাঠোদ্ধার করেন। উন্মোচিত মিসরীয় সভ্যতা। লেখক বিস্তৃত তুলে এনেছেন এসব। লেখক ইউরোপ থেকে বারবার ফিরে এসেছেন বাংলাদেশে। উজেন দোলাখোয়ার স্বাধীনতা ছবির গ্যাভশের সাথে তুলনা করেন রশীদ তালুকদারের উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আলোকচিত্রের টোকাইয়ের। প্যারিসে টোকাই মানে গ্যাভশ। পরজন্মে শাপোলিওঁ মিসরের প্রাচীন থিবসে নগরে জন্ম নিতে চান। সেখান থেকে লেখক চলে যান, জীবনানন্দ দাশের আবার আসিব ফিরে কবিতায়।

শার্ল দো গল স্কোয়ারের সাথে তুলনা করেন বগুড়ার সাতমাথার। সপ্তম এডওয়ার্ডের কথা লিখতে গিয়ে চলে যান বগুড়ার এডওয়ার্ড পার্কে। বইটির মূল প্রাণশক্তি বাংলা বানানে বিদেশি শব্দ। বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে আমরা ইংরেজি ধ্বনিতে অভ্যস্ত। লেখক মূল ভাষায় গিয়েছেন। তাই লিওনার্দো হয় লেওনার্দো, মিউনিখ হয় মুনশেন, ওয়ারশ হয় ভারশাভা, কিংবা ইতালির পিসা হয় পিজা। ইংরেজি মাকিয়াভেলি হয় মাকিয়াভেল্লি। লেখক ফরাসি প্রাসাদের পাথরের মাঝে লুকিয়ে থাকা নৃপতির চরিত্র তুলে ধরেন। স্থপতির কথা না জানলে প্রাসাদ পরিণত হয় কয়েক টুকরো পাথরে। এভাবে জানলে আর মনে হবে না, ইউরোপের সব প্রাসাদ একই রকম। বইটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফরাসি দেশে ব্যক্তিগত ভ্রমণ পরিণত হয়েছে সমষ্টির স্মৃতিচারণে। একসময় মনে হবে, ফরাসি দেশের কাহিনি যেন বাংলাদেশের গল্প। পৃথিবীর সব দেশ, ইতিহাস এক সুতোয় গাঁথা।

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *