‘৫৫ বছর ধরে নদী ভাঙতেছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখতেছি। ভাঙতে ভাঙতে চলেই যাচ্ছে। ১০-১২ বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। অবশিষ্ট ১০ কাঠার ওপর বাড়িটুকু ভাঙার পথে। ভাঙতেছে এপারে (পূর্ব)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার বালু ফেলায়ে ভরতেছে ওপারে (পশ্চিম)।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুমারখালীর আগ্রাকুণ্ডা গ্রামের মো. মোশারফ হোসেন (৬০)।
গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে রয়েছে তেবাড়িয়া, আগ্রাকুণ্ডা, খয়েরচারা ও পাথরবাড়িয়া গ্রাম। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বাঁধ না থাকায় ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে ভাঙছে প্রায় চার কিলোমটার নদীপাড়। চারটি গ্রামের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি, ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিলীন হয়েছে। অন্যত্র চলে গেছে কয়েকশ পরিবার। হুমকিতে রয়েছে কয়েকশ পরিবার, কৃষিজমি এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে দু’শতাধিক বছরের পুরোনো পাথরবাড়িয়া আহলে হাদিস জামে মসজিদ। স্থানীয় বাসিন্দা জালাল জোয়ার্দার বলছেন, ভাঙতে ভাঙতে নদী অর্ধকিলোমিটার সরে এসেছে। ১০ বছরে তিনবার ঘর-বাড়ি ভেঙে সরিয়েছেন তিনি। ১০ বিঘা জমির মধ্যে ৫ কাঠার ওপরে বসতবাড়ি আছে।
জানা গেছে, ভাঙন রোধে গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উদ্যোগে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগসহ পাড় ভেঙে নদীতে চলে গেছে। নতুন পানি আসার আগে বাঁধ নির্মাণ করা না হলে চারটি গ্রামের অবশিষ্ট অংশ বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
গত সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, চর জেগে ওঠা নদীতে নেই স্রোত। প্রায় চার কিলোমিটার তীরজুড়ে রয়েছে ভাঙনের ক্ষত। আগে ফেলা জিওব্যাগ চলে গেছে নদীতে। এ সময় আক্ষেপ করে পাথরবাড়িয়া এলাকায় সীতা রানী বলছিলেন, ‘নদীতে পানি এলে জান ঠোঁটের ওপরে থাকে- কখন যেন সব ভেঙে চলে যায়! আতঙ্কে চোখে ঘুম আসে না।’ তিনবার ঘর ভেঙে সরিয়ে নিয়েছেন। এবার ভাঙলে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে তাঁর।
প্রায় ২০০ বছর আগে নদীপাড়ে পাথরবাড়িয়া আহলে হাদিস জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয় বলে দাবি ইমাম মো. শফিকুর রহমানের। তাঁর ভাষ্য, এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ছিল নদীর প্রবাহ। কিন্তু ভাঙতে ভাঙতে এখন মসজিদের কাছে চলে এসেছে। বাঁধ নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় মসজিদটি বিলীন হতে পারে।
ভাঙনে কয়েকশ বিঘা জমি চলে গেছে নদীতে। শত শত পরিবার এলাকা ছেড়েছে। এমন দাবি করে ভ্যানচালক আবু বক্কর বলেন, এখনও ভাঙছে। তবুও বাঁধ নির্মাণ হয়নি। কুমারখালী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও খয়েরচারা গ্রামের বাসিন্দা জিল্লুর রহমান মধুর কথায়, বাঁধ না থাকায় অসংখ্য পরিবার, কৃষিজমি, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুমকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় বিলীন হবে চারটি গ্রাম।
নদীভাঙন রোধে পাউবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন বলে জানান ইউএনও মাহবুবুল হক। আর নদীর পশ্চিম পাড়ে সিভিল বিভাগের বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে জানিয়ে কুষ্টিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজার) সৈকত আহমেদ বলেন, বালু ভরাট করে ভাঙন রোধ সম্ভব নয়। পাকা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
পাউবোর সিভিল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান ফোন কল রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে কুষ্টিয়া-৪ আসনের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ বলেন, ভাঙন রোধে পাকা বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

০ Comments