ক্ষুদ্র খেজুরের বৃহৎ সিন্ডিকেট

by | ফেব্রু ২৯, ২০২৪ | সম্পাদকীয় | ০ comments

সরবরাহ সংকট হেতু বাজারে যখন খেজুরের ‘আগুন দর’, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন গুদামে ঐ পণ্যভর্তি কনটেইনারের ‘জট’ নিঃসন্দেহে স্বাভাবিক বিষয় হইতে পারে না। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, গত বৎসর অপেক্ষা এই বৎসর মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়াছে ১০০ হইতে ৪০০ টাকা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যটির প্রায় এক সহস্র কনটেইনার খালাসের অপেক্ষায়; যেগুলির মধ্যে চার শতাধিক কনটেইনার দুই মাস যাবৎ অনড়। প্রতিটি কনটেইনারের ২৪-২৫ টন ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বন্দরে অপেক্ষমাণ খেজুরের ওজন দাঁড়ায় ২৪-২৫ সহস্র টন, যাহা বলা চলে রমজানে পণ্যটির সম্পূর্ণ চাহিদার প্রায় অর্ধেক। একসঙ্গে এত পণ্য বন্দরে ‘আটকা’ পড়িলে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর বাজারে খেজুরের অগ্নিমূল্য হইবে না কেন? দীর্ঘ কাল বন্দরে বিপুল পরিমাণ খেজুর অনড় থাকিবার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদিগের সম্ভাব্য শুল্ক হ্রাস-সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের সুবিধা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষাও থাকিতে পারে। তবে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তার এই বক্তব্যও ফুৎকারে উৎক্ষেপের অবকাশ নাই– ‘রাঘববোয়াল’ আমদানিকারকরাই অত্যধিক মুনাফার অভিলাষে এতদিন উহা খালাস করে নাই।

রমজান মাসে বর্ধিত চাহিদাকে পুঁজি করিয়া অতি মুনাফার জন্য বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বৃহৎ কারবারিরা পরস্পর যোগসাজশে, বিশেষত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কীভাবে বাজারকে তাতাইয়া তোলে, উহা আমরা জানি। বিশেষত ইফতারের প্রায় অনিবার্য অনুষঙ্গ খেজুরের বাজারে কতিপয় বৃহৎ ব্যবসায়ীর ‘সিন্ডিকেট’ বা বেআইনি চক্রও নূতন নহে। ইহাও সত্য, অন্যান্য বৎসর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী রমজান মাস উপলক্ষে খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করিলেও এই বৎসর তীব্র ডলার সংকটের কারণে সকল পণ্য আমদানিতেই বৃহৎ ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হইতেছে। প্রশ্ন হইল, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষসমক্ষে বিপুল খেজুর দীর্ঘ কাল বন্দরে আটকাইয়া থাকে কীভাবে? ইতোপূর্বে সরকারই নিয়ম করিয়াছে, বিশেষত কোন নিত্যপণ্য কতদিন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর জিম্মায় থাকিতে পারিবে। খেজুরের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম প্রয়োগ করা হইল না কেন?

আমরা প্রত্যাশা করিব, বিলম্বে হইলেই সংশ্লিষ্টরা সক্রিয় হইবেন। কারণ যথেষ্ট আমদানির পরও বাজারে খেজুরের ঘাটতি কোনোক্রমে গ্রহণযোগ্য নহে। রমজানের ন্যায় সংযমের মাসে এহেন অসংযমী আচরণের জন্য যে বা যাহারাই দায়ী, তদন্তপূর্বক তাহাদের সকলকে আইনি বেষ্টনীতে আনয়ন জরুরি। তবেই অন্যান্য নিত্যপণ্যের কারবারিও এহেন অসদুপায় অবলম্বন হইতে বিরত থাকিবে; রোজাদারগণ স্বস্তিতে সিয়াম সাধনায় মনোযোগী হইতে পারিবেন। স্মরণে রাখিতে হইবে, খেজুর নিছক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নহে; রমজান মাসে পণ্যটির ব্যাপারে সংখ্যাগুরু নাগরিকের সংবেদনশীলতাও আমলযোগ্য। কারসাজির হোতাদের বিরুদ্ধে এখনই পদক্ষেপ গৃহীত না হইলে, উক্ত খেজুর বন্দর হইতে খালাস হইবার পরও বাজারে না আসিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর গুদামে জমা হইতে পারে। উহাতে খেজুরের বাজারে যদ্রূপ অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা রহিয়াছে, উহার জের ধরিয়া অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও তদ্রূপ অস্বচ্ছ জলের মৎস্য শিকারিরা সক্রিয় হইয়া উঠিতে পারে।

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *