বেষ্টনীই খাইতেছে জাটকার ক্ষেত!

by | ফেব্রু ২৯, ২০২৪ | সম্পাদকীয় | ০ comments

দেশে প্রতিবৎসর নভেম্বর হইতে জুন পর্যন্ত ‘জাটকা নিধন প্রতিরোধ কার্যক্রম’ চলাকালেই উহা আহরণের ‘মহোৎসব’ কীভাবে চলিয়া থাকে; বুধবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে খণ্ডচিত্র উঠিয়াছে মাত্র। ‘জাটকা’ বলিয়া পরিচিত অনধিক ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ইলিশ-পোনা এই আট মাস আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকিবার বিধান থাকিলেও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাঠ প্রশাসনকে ‘খুশি’ করিয়া ঐগুলির সকলই চলমান।

বরিশাল, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা হইতে প্রাপ্ত সংবাদে দেখা যাইতেছে, মৎস্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠ কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রকে রীতিমতো মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দিয়া অবাধে চলে জাটকা নিধন। এমনকি শরীয়তপুরের আড়ত হইতে প্রতিদিন পুলিশের মেসেও জাটকা যায় ‘উপহার’রূপে। মাঝেমধ্যে নিয়মরক্ষার অভিযান চলিলেও পূর্বেই খবর পৌঁছাইয়া যায় জেলেদের নৌকায়। যে কারণে কদাচিৎ ‘পরিত্যক্ত’ জাটকা জব্দ হইলেও হোতাদের কদাচ আটক পরিদৃষ্ট নহে। উপলব্ধি কঠিন নহে, দেশের প্রধান ইলিশাঞ্চল বলিয়া পরিচিত মেঘনা ও সংলগ্ন নদীগুলির বাহিরের চিত্রও অভিন্ন। ইহাও স্পষ্ট– বেষ্টনীই ভক্ষণ করিতেছে জাটকার ক্ষেত।

আমরা জানি, দেশে ইলিশের সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন মেয়াদ ও মাত্রায় মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা কিঞ্চিৎ সমালোচনা সত্ত্বেও সাধুবাদ পাইয়া আসিয়াছে। ইহাও সত্য, জাটকা বা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির অতি কঠোরতা ও অসংবেদনশীলতা লইয়া অত্র সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা অনেকবার প্রশ্ন তুলিয়াছি। জাটকা রক্ষা করিতে গিয়া দরিদ্র জেলের উপর নির্যাতন, একমাত্র সম্বল জাল-নৌকা ভস্মীভূতকরণ, অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড, এমনকি প্রাণহানি কোনো যুক্তিতেই কাম্য নহে। অপরদিকে মৎস্য আহরণ হইতে বিরত জেলে পরিবারগুলির জন্য সাময়িক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির বাস্তবায়ন লইয়াও প্রশ্ন কম নাই। প্রায় প্রতিবৎসর দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হইবার পর সপ্তাহ বা মাস অতিক্রান্ত হইলেও ত্রাণের চাউল জেলেদের নিকট পৌঁছায় না। একদিকে আয়ের প্রধানতম পথ বন্ধ, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে হিমশিম জেলে অনেকেই ক্ষুধার জ্বালায় জাল লইয়া জলে নামেন। আমরা প্রত্যাশা করিয়াছিলাম, এই অব্যবস্থাপনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হইবে। কিন্তু আলোচ্য প্রতিবেদনে উঠিয়া আসা চিত্র আমাদের স্তম্ভিতই করিয়াছে। ইহাতে একদিকে জাটকা রক্ষা হইতেছে না, অন্যদিকে জেলেদের পরিশ্রমের গুড়ও খাইয়া যাইতেছে রাজনীতি-প্রশাসন চক্রের পিপীলিকা।  

স্বীকার্য, নিষেধাজ্ঞার সুফলরূপে ইলিশের উৎপাদন লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তৎসহিত রপ্তানিও। দুই দশক পূর্বেও যে ইলিশ মধ্যবিত্তের জন্য উৎসবের উপলক্ষ ও নিম্নবিত্তের জন্য ছিল প্রায় অধরা, উহা এখন সকলের পাতে মিলিতেছে। কিন্তু উৎপাদন ঘিরিয়া সার্বিক ও সামগ্রিক সমৃদ্ধির পরিবর্তে গোষ্ঠীবিশেষের পোয়াবারো যদি নিশ্চিত হয়, তাহা হইলে তো সকলই গরল ভেল!

আমরা মনে করি, জাটকা ও মা ইলিশ লইয়া নিষেধাজ্ঞামূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও সুচারু হইবে। সর্বাগ্রে বন্ধ করিতে হইবে জেলেদের জিম্মি করিয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব। নদী কাহারও জমিদারি নহে; ইলিশও নহে তালুক। স্বাধীন বাংলাদেশের জেলে সমাজও রাজনীতিক ও প্রশাসকগণের প্রজা হইয়া থাকিতে পারে না। 

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *