সাইবার নিরাপত্তা আইনের পাঁচটি ধারা সাংবাদিকদের বিপদে ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ। তিনি বলেন, আইনের ২২, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৮ ধারা যেকোনোভাবে সাংবাদিকরা বিপদে পড়তে পারে। যদিও ২৯ ধারায় মানহানির বিষয়ে হয়তোবা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে, কিন্তু কয়েকটা সেকশন খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে সাংবাদিকতায়।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের দক্ষিণ হলে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ও আইন সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। এ কর্মশালার আয়োজন করে ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ)।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই আইনটা (সাইবার নিরাপত্তা আইন) সাংবাদিকবান্ধব আইন বা ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন–বান্ধব আইন। বারবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আগে মানহানির জন্য হুট করে জেলে দেওয়া যেত। এখন জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন বোদ্ধা ব্যক্তি যারা, তারাও বিভিন্ন আর্টিকেলে এ নিয়ে কথাগুলো বারবার বলে এসেছেন।
আইনের ২২ ধারায় ‘ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক জালিয়াতি’ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারাটি তুলে ধরে শেখ হাসান আরিফ বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতি করেন, তাহলে ওই ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হবে একটি অপরাধ। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতি বলে কোনো সংজ্ঞা এই আইনে নেই। আপনি সংজ্ঞায়িত করেন জালিয়াতিটাকে- কোন কাজটা করলে আমার জালিয়াতি হবে, কোন কাজটা করলে আমার জালিয়াতি হবে না? এখন যদি সংজ্ঞায়িত না করেন, তাহলে একেক সময় একেক সরকার আসবে একেক ভিউ (দৃষ্টিভঙ্গি) নিয়ে।
তিনি আরও বলেন, মন্ত্রীদের একেকজনের একেক ধরনের মাইন্ডসেট (মানসিকতা) থাকে। কেউ সাংবাদিকবান্ধব হয়, কেউ খুব বেশি সমালোচনা সহ্য করতে পারে না- ইনটলারেন্স থাকে অনেকের প্রচণ্ড। তারপরে আমাদের পলিটিক্যাল অ্যাটমোস্ফেয়ারও ইনটলারেন্স (রাজনৈতিক পরিবেশও অসহিষ্ণু)।
‘ইনফ্যাক্ট ১৯৯১ থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে যখন একটা সরকার পরিবর্তনের পদ্ধতি মোটামুটিভাবে চালু হয়েছে, তখন থেকেই দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের ইনটলারেন্স (অসহিষ্ণুতা) আমরা লক্ষ করেছি। কোনো ধরনের সমালোচনা হলে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন-এগুলো ছাড়া আর কোনো পন্থা উনাদের হাতে খোলা আছে বলে মনে করেন না। এ ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দমন করতে গিয়ে দেখা যায় সাংবাদিকেরাও এটার ভিকটিম (ভুক্তভোগী) হয়ে যান।’
বিচারপতি বলেন, এ ক্ষেত্রে এ ধরনের একটা ধারা খুব মারাত্মক একটা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে। আদালত রিপোর্টিংয়ে হয়তোবা না-ও হতে পারে।
আইনের ২৩ ধারায় ‘ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণা’ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এই ধারাটি তুলে ধরে শেখ হাসান বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করেন, তাহলে ওই ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হবে একটি অপরাধ। অপরাধ হলে ৫ বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।
ধারাটিতে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণা অর্থ কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে অথবা অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম, ডিজিটাল নেটওয়ার্কে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো তথ্য পরিবর্তন করা, মুছে ফেলা, নতুন কোনো তথ্যের সংযুক্তি বা বিকৃতি ঘটানোর মাধ্যমে যার মূল্য বা উপযোগিতা হ্রাস করা, তার নিজের বা অন্য কোনো ব্যক্তির কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির বা ক্ষতি করার চেষ্টা করা বা ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করা।
তিনি আরও বলেন, এটাতে হয়তো বা খুব বেশি সাংবাদিকদেরকে ধরতে পারবে না। কিন্তু ইনজেনারেল যারা মিডিয়া ব্যবহার করে, এখন মিডিয়া ব্যবহার করার সংখ্যা বাংলাদেশে জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশের মতো হয়ে গেছে। এখন গরিব জনগোষ্ঠী যারা তাদের হাতেও মোবাইল ফোন আছে, ফেসবুক ব্যবহার করছে, ইউটিউব দেখছে ও আপলোড করছে। এটা ইন জেনারেল (সাধারণভাবে) অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ধারা।
ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি শামীমা আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান।

০ Comments