সরকারি বাড়ি কবজায় নিতে তোড়জোড় সাবেক আমলার

by | ফেব্রু ২৫, ২০২৪ | রাজধানী | ০ comments

চাকরি থেকে প্রায় ছয় বছর আগে অবসরে গেলেও রাজধানীর তিন তলার একটি নান্দনিক সরকারি বাড়ি অবৈধভাবে দখলে রেখেছেন একজন সাবেক আমলা। তিনি কোনো ভাড়াও দেন না। পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলও পরিশোধ করেন না। উল্টো ৩০ কোটি টাকা দামের বাড়িটি তিনি তাঁর নামে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দেনদরবার করছেন।

দাপুটে সাবেক এই কর্মকর্তা হলেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ড. আশরাফুল ইসলাম। অবসর গ্রহণের আগে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বাসা বরাদ্দ দেওয়া। সেই সুযোগে তিনি নিজেই এলিফ্যান্ট রোডের ছায়াঘেরা ১০ কাঠার একটি বাড়ি নিজের নামে বরাদ্দ নেন।

বাড়িটির মালিক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বছরের পর বছর বাড়িটিতে তিনি আরাম-আয়েশে সপরিবারে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে পেনশন তুলে নেওয়ায় সরকারও তাঁর বেতন থেকে ভাড়ার অর্থ আদায় করতে পারছে না।

রাজধানীর নিউ এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যালের অদূরেই বাড়িটির অবস্থান। সেখান থেকে পুরোনো এলিফ্যান্ট রোড ধরে গাউছিয়া মার্কেটের দিকে কিছুদূর এগোলে পূর্বদিকে একটি রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলেই ডান পাশে বাড়িটির অবস্থান।

জানা গেছে, ড. আশরাফুল ২০১৭ সালের ৮ জুন অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে যান। এক বছর পর ২০১৮ সালের ৭ জুন তাঁর অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটি শেষ হয়। নিয়ম অনুযায়ী, তখনই তাঁর সরকারি বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা। তবে বিশেষ প্রয়োজনে আবেদন করলে নতুন বাসা খোঁজার জন্য আরও দুই মাস তিনি সরকারি বাড়িতে থাকতে পারেন। কিন্তু তার পর আর ওই বাড়িতে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

২০১৩ সালের ৭ আগস্ট যুগ্ম সচিব ড. আশরাফুল ইসলামকে আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক পদে পদায়ন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তখন তিনি ৩৩১ এলিফ্যান্ট রোডের একটি তিন তলা সরকারি বাড়ি পছন্দ করে নিজের জন্য বরাদ্দ নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালেই তিনি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান। ২০১৬ সালের ১২ মে তিনি এ পদে থেকেই অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (পিআরএল) যান।

ছুটিতে যাওয়ার আগে তিনি একটি অসাধু কৌশল নেন। ওই বাড়িটিকে সরকারের ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। পরে পিআরএলে গেলেও ওই বাসাতেই তিনি বসবাস করতে থাকেন। অথচ পরিত্যক্ত কোনো সম্পত্তি বা বাড়িতে সরকারি কর্মকর্তার বসবাস করারও সুযোগ নেই।

অবশ্য পিআরএলে থাকাকালে এক বছর তাঁর বেতন থেকে বাসা ভাড়া বাবদ মূল বেতনের ৬০ শতাংশ অর্থ ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল বাবদ কর্তন করা হতো। তিনি পূর্ণাঙ্গ অবসরে যাওয়ায় সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে পেনশনও তুলে নেন। ফলে তাঁর বেতন থেকে বাসা ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল কর্তনের সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।

চালানের মাধ্যমে কখনও তিনি কোনো ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করেননি। কয়েক দফা নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি তা আমলে নেননি। উল্টো আবাসন পরিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের প্রশ্ন ছুড়ে দেন পরিত্যক্ত বাড়ির আবার ভাড়া কীসের?

আবাসন পরিদপ্তরের সাবেক পরিচালক হওয়ায় মন্ত্রণালয় ও আবাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারাও তাঁকে শক্ত করে কিছু বলতে পারেননি। আগের নিয়মে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ওই বাড়ির বিপরীতে ভাড়া বকেয়া পড়েছে ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭৫ টাকা। এর পর আরও প্রায় এক বছর অতিবাহিত হয়েছে। সেই ভাড়াও আর হিসাব করেনি আবাসন পরিদপ্তর।

আবাসন পরিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৩ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দসংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পিআরএল-পরবর্তী সময়ে কোনো কর্মকর্তা সরকারি বাড়িতে অবস্থান করলে তাঁর সর্বশেষ বেতন স্কেলের শতভাগ অর্থ বাড়ি ভাড়া বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হবে। সেই নিয়মও ড. আশরাফুলের ক্ষেত্রে আরোপ করা হয়নি। এসব ঝামেলা এড়াতে সম্প্রতি ড. আশরাফুলের বাড়ি দখল করে রাখা-সংক্রান্ত ফাইলটি অডিটর জেনারেলের অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, লোহার গ্রিলের গেটে একটি সাইনবোর্ডে লেখা, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. মো. আশরাফুল ইসলাম। অতিরিক্ত সচিব (অব.), ৩৩১, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।’

ভেতরে নানা ধরনের গাছপালার সমাহার। একটি আমগাছ মুকুলে ভরে গেছে। আরও আছে নিম-শজনে প্রভৃতি গাছগাছালি। গাড়ি রাখার জন্য একটি ছাউনি। সামনে কাঠাখানেক জায়গায় উঠান। আর পাশেই তিন তলা হলুদরঙা বাড়িটি। আয়তন প্রায় ১০ কাঠার মতো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়িটির দাম প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

বাড়িটিতে গাড়ির শেডের সঙ্গে খাটে শুয়ে থাকা ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানান, ‘স্যার কয়েক দিন হলো সপরিবারে গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরে গেছেন। কবে আসবেন, বলতে পারছি না।’

এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আবাসন পরিদপ্তরের বর্তমান পরিচালক শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। শহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বাড়ি থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করার ফাইল অনুমোদন হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট তারেক হাসানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অভিযান চালিয়ে বাড়ি খালি করার। খুব শিগগির অভিযান চালানো হবে।

অবৈধভাবে সরকারি বাড়ি দখল করে রাখা সম্পর্কে ড. আশরাফুল মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই হিসেবে বাড়িটি তাঁকে বরাদ্দের জন্য বেশ আগেই আবেদন করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে বাড়িটি বরাদ্দ দেবে। এ জন্যই তিনি ভাড়া পরিশোধ থেকে বিরত আছেন। দখল করে রাখার মতো কোনো ব্যাপার এখানে নেই।

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *