রাজনীতিকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত লাভের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঠিকাদারি কাজ বা ব্যবসা পেতে রাজনৈতিক পরিচয় বড় ভূমিকা রাখছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে শৃঙ্খলা ও আদর্শের অভাবও দেখা যাচ্ছে। গতকাল ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে গবেষণা সংস্থা সানেম আয়োজিত অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী দলীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং বিকাশ: গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য পরিণাম কী?’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষজ্ঞরা এমন মত দেন।
অধিবেশনের বিশেষ অতিথি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দেশে ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের দুটি জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য যুগান্তকারী সাফল্য এনে দেয়। অবাধ এবং অংশগ্রহণমূলক দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমে খালেদা জিয়া এবং পরের বার শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও বড় অবদান রাখেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও বাংলাদেশের এই নির্বাচন ব্যবস্থা অনুসরণ করে। অবশ্য বাংলাদেশেই গণতন্ত্রের সেই চর্চা পরবর্তী সময়ে আর অনুসরণ হয়নি। ১৯৯৬ সালের মতো নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের চর্চা আওয়ামী লীগও অনুসরণ করেনি, বরং ক্ষমতা কত দীর্ঘ করা যায়, সে চেষ্টাই করছে তারা। রাষ্ট্র এখন এক দলের নিয়ন্ত্রণে। দু’দল বা বহু দলের অংশগ্রহণ খুব একটা দেখা যায় না। তিনি মনে করেন, শক্তিশালী বিরোধী দলই শেষ পর্যন্ত ভরসা।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. মির্জা এম হাসান। প্যানেল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূরাজনীতির প্রভাব প্রসঙ্গে ড. রেহমান সোবহান বলেন, এ ধরনের প্রভাব সব সময়ই ছিল। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় রাখা এবং ক্ষমতার বাইরে রাখার বিষয়ে তাদের ভূমিকা থাকে। তবে কিছু ডলারের ব্যবসা দিলে তাদের রাজি রাখা যায়। সবকিছু ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যায়।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ এখন বাংলাদেশের ব্যবসা মডেলের অংশ হয়ে গেছে। সব ব্যবসা এখন সিন্ডিকেটের কবজায়। তবে সব ব্যবসায়ী এর সঙ্গে জড়িত নন, কিংবা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে খেলাপি নন। রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা এর সঙ্গে জড়িত। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, পরিশোধ করেন না। পুনঃতপশিলের ব্যবস্থা করে নেন। টেন্ডারেও তারাই অংশ নেন। রাজনীতিকে তারা ভাগ্য বদলের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানেই রাজনৈতিক পরিচয় আগে দেখা হয়। এটা এক ভয়ংকর পরিস্থিতি, যা উন্নত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে বড় বাধা।
অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে দেশে আসলে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক দলীয় পদ্ধতি হচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত নিয়মকানুন চাপানো হচ্ছে– তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আবার রাজনৈতিক দল বলতে আসলে কিছু আছে, নাকি কিছু নেতার অনুগত লোক তৈরি হচ্ছে– সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
রওনক জাহান মনে করেন, রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঘাটতি আছে। ক্রমাগতভাবে দলীয় পদ্ধতি হারিয়ে যাচ্ছে। সব ক’টি দল প্রায় ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। দল বলতে যা বোঝায় শৃঙ্খলা, আদর্শ– এসব থাকছে না। আবার এখন দলের প্রভাবের চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, আর আমাদের এখানকার ভূমিকা এক নয়। অন্যরা সব শ্রেণির মানুষের অধিকারের জন্য রাজনীতি করেন। আমাদের এখানে রাজনীতি, ট্রেড ইউনিয়ন সবই হচ্ছে ব্যক্তিগত লাভকে কেন্দ্র করে। এবার কিছু আসন স্বতন্ত্রদের ছেড়ে দেওয়াকে রাজনীতিতে একটা ‘ইনোভেশন’ বলা হচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে ধরে রাখতে না পেরে অনেকটা বাধ্য হয়ে কিছু আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর মতে, এখন সব নিয়ন্ত্রণ করছেন ব্যবসায়ীরা।
অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগের ক্ষমতা শূন্য। হাসিনাকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। হাসিনাও অনেক সময় তাঁর নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। রাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী। সেনাবাহিনী, আমলা– এ দুটি অংশ ছাড়া আওয়ামী লীগ এভাবে জিততে পারত না। তাদের ব্যবহার না করে বিএনপিকে এভাবে নির্বাচনের বাইরে রাখতে পারত না। আওয়ামী লীগ গোয়ান্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিএনপিকে ট্রাপে ফেলে নির্বাচনে জিতে গেছে। তার মানে শেখ হাসিনা তাঁর দলীয় কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল নন। এখন প্রশ্ন হলো, এটি টেকসই হবে কিনা। আমার ধারণা, টেকসই হবে না।
তিনি বলেন, ভৌগোলিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সফল হয়েছে। চেষ্টা করেও যুক্তরাষ্ট্র এখানে কিছু করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ ভারতকে সঙ্গে রেখেছে। পদ্মা সেতু করতে চীনের সহায়তা নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শুরু থেকেই একদলীয় প্রভাবে চলছে। ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত দেশে একদলীয় শাসন পদ্ধতি ছিল। ’৭৫ থেকে ’৯০ পর্যন্ত হলো সামরিক পদ্ধতি। এর পর থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক দল ছিল। তবে দু’দলের মধ্যে ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল। দুটি দলেরই উদ্দেশ্যে ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা। যে কারণে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ড. মির্জা এম হাসান বলেন, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনীতি, সব মন্ত্রণালয়, নাগরিক সমাজ– সবই নিয়ন্ত্রণ করে একটি পক্ষ। বর্তমানে ভারত, জাপান একদলের কর্তৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্র। আর বাংলাদেশে একদলীয় রাষ্ট্রের বিতর্ক উঠেছে নিউইয়র্ক টাইমস এবং ডেইলি স্টার সম্পাদকের একটি নিবন্ধনের পর। যদিও আইনগতভাবে বাংলাদেশকে একদলীয় রাষ্ট্র বলা যাবে না। কেননা, এখানে নিবন্ধিত অনেক দল আছে। এখানকার বেশির ভাগ মানুষের নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কিনা, আইনের শাসন আছে কিনা, তা নিয়ে আগ্রহ নেই। বেশির ভাগ মানুষ জানতে চায়, জিনিসের দর কমবে কিনা? দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে যাওয়ায় এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন কমেছিল। তবে গরিব মানুষ সংগঠিত নন। তাদের পক্ষে অনেক বড় দল নেই। তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য নাগরিক সমাজ নেই। যে কারণে গার্মেন্টকর্মীরা বেতন বৃদ্ধির দাবি থেকে সরে এসেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও বলেছেন, বিএনপি নিয়ে আমরা চিন্তিত না, চিন্তা জিনিসের দর নিয়ে। যদিও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ঘুমাতে যাওয়ার আগে বিএনপিকে একটা গালি দেয়, ঘুম থেকে উঠে আরেকটা গালি দেয়।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের আগে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক চাপ ছিল। নির্বাচনের আগে ভৌগোলিক রাজনীতির অংশ হিসেবে ভারত, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগ্রহ দেখা গেল। ফলে একটি পক্ষের দিক থেকে এখনও চাপ রয়ে গেছে। আরেকটি বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন দল মনে করেছিল বিভিন্ন প্রলোভন, কিংস পার্টি– এসব উপায়ে বিএনপি ভেঙে শেষ করে দেওয়া যাবে। তবে তা হয়নি। পাশাপাশি একটি শক্ত বিরোধী দল তৈরির চেষ্টাও সফল হয়নি। নির্বাচনের আগে বিএনপি বুঝেছিল, দেশের ভেতর থেকে কিছু হবে না। যে কারণে বাইরের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। তবে তা সফল হয়নি। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক তুলে দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের একটা উদ্ভাবন। জাতীয় নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এটা করেছে।
ড. আশিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোটামুটি চারটি নির্বাচন তুলনামূলক স্বচ্ছ হয়েছে। তার পরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যত ভালো নির্বাচনই হোক, ভালো গণতন্ত্র হবে কিনা– প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোটাই দুর্বল। পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা সব দেশের দিকে তাকালে তা বোঝা যায়। তিনি বলেন, ভালোরা বেশির ভাগ সময় হেরে যায়। এর একটা বড় কারণ, তারা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না।

০ Comments