প্রচ্ছদ নহি দেবী নহি সামান্যা নারী

by | ফেব্রু ২৯, ২০২৪ | কালের খেয়া | ০ comments

গতকাল গভীর রাতে একজন কবি ও কথাসাহিত্যিক আমাকে ফোন করে অদ্ভুত একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, আপা, এই যে আপনারা এত গল্প লেখেন, উপন্যাস লেখেন, সেখানে অনেক পুরুষ চরিত্র থাকে, তাদের নিয়ে লিখতে গেলে, তাদের মনোজগৎ নিয়ে কাজ করতে গেলে আপনাদের কোনো সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা বোধ হয় না? বা কোনো সমস্যা হলে কীভাবে সেটার সমাধান করেন? নাকি করেন না?  

প্রশ্নটা যখন কানে শুনলাম তখন মনে মনে বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ কখনও কোনো দিন এরকমের সমস্যার কথা লেখালেখি করতে গিয়ে আমার মনে হয়নি। পরে মনে হলো, এটা একটা প্রশ্ন বটে। বিশেষ করে যেসব নারী একদিন অতিশয় পর্দার ঝকমারি থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে লেখক হয়েছেন, তারা কীভাবে তাদের গল্প বা উপন্যাসে পুরুষ চরিত্রগুলোকে নির্মোহ দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন? কীভাবে তাদের মনোজগৎকে লেখার অক্ষরে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বা আদৌ পেরেছেন কিনা।

আমার অনেক উপন্যাস আছে। অনেক ছোটগল্পও আছে। সব মিলিয়ে একটা বড় বস্তা তো অবশ্যই হবে।

সেখানে অনেক পুরুষ চরিত্র আছে। সেইসব পুরুষ সকলেই যে ভালো চরিত্রের তা তো নয়, তাদের কেউ রাগী, কেউ বদমেজাজি, কেউ হিংস্র, কেউ স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসঘাতক– এদের সংখ্যাই বেশি, কেউবা নপুংসক, কেউ গুন্ডা, কেউ চণ্ডাল, কেউ অতিশয় ভালো, কেউ দেশপ্রেমিক, কেউ মুক্তিযোদ্ধা, কেউ বিশ্বাসহন্তা প্রেমিক, কেউ স্ত্রীর অহেতুক অত্যাচারে জর্জরিত, তবু স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যায় না!

এতসব পুরুষ চরিত্র কীভাবে আঁকলাম? একজন মেয়ে হিসেবে আমার ভুবন তো গণ্ডিবদ্ধ, হাত দিয়েই যা মাপা যায়। সে ক্ষেত্রে এত সুনিপুণভাবে আমি পুরুষ চরিত্র আঁকলাম কীভাবে?
সুনিপুণ বলছি এ কারণে যে, আমার আল্লার রহমতে প্রচুর পাঠক আছেন, যারা আমার বই পড়েন এবং উপভোগও করেন। সেখানে হঠাৎ করে গভীর রাতে একজন এই প্রশ্নটা আমাকে করে বসলেন। 

‘আপা, আপনার লেখায় পুরুষ চরিত্র আঁকতে গিয়ে মনের ভেতরে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয় না? বা পুরুষের মনোজগৎ কল্পনা করতে কষ্ট হয় না?’

আমার মনে হলো, তিনি বলতে চেয়েছেন লিখিয়ে মেয়েদের সামাজিক লজ্জার কথা বা মানসিক বাধার কথা বা অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথা।

প্রশ্নটা আমাকে বিস্মিত করেছে। কিন্তু সত্যি বলতে এর মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই।

কারণ এরকমের একটি প্রশ্ন একজন মানুষের মধ্যে হতেই পারে। তবে বিস্ময়ের কথা হচ্ছে, তিনি নিজেও একজন নামকরা লেখক। তিনি যখন নারী চরিত্র আঁকেন তখন কিন্তু আমাদের মনের মধ্যে একবারও এই প্রশ্ন আসে না যে এত সুন্দর করে তিনি নারী চরিত্র আঁকলেন কীভাবে?

আমরা নিজেরাও জানি না, নারী চরিত্র আঁকতে গেলে পুরুষ লেখকদের কোনো কষ্ট হয় কিনা। কোনো প্রকারের ট্যাবু মনের মধ্যে কাজ করে কিনা। কারণ আমরা লেখক হলেও কিন্তু সামাজিক জীব। আমাদের মনের মধ্যে অনেক ধরনের চিন্তার জটিলতা থাকে। তাই পুরুষ লেখকদের মনের মধ্যেও অনেক ধরনের ইতস্তত ভাব থাকতে পারে, হয়তো এ জন্য তারা নারী চরিত্রের সংলাপে ইচ্ছা হলেও অনেক কথা বসাতে পারেন না। 

অবশ্যই সমাজের মেয়েদের দেখেই পুরুষ লেখকরা তাদের সাহিত্য রচনা করেন। অন্য লেখকের কিছু বইপত্র পড়েও করেন। তবু তো এসব রচনার মধ্যে অনেক ফারাক থাকতে পারে। কিন্তু কই কোনো ফারাক তো আজ পর্যন্ত আমরা দেখিনি! 

রবীন্দ্রনাথ থেকে, নজরুল থেকে, শরৎচন্দ্র থেকে, বুদ্ধদেব থেকে, সৈয়দ হক থেকে, হাসান আজিজুল হক থেকে, হুমায়ূন আহমেদ থেকে কোনো ফারাক আমাদের চোখে পড়েনি। পড়লে তো আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রতিবাদ করতাম বা ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতাম!

মেয়ে লেখকের বেলাতেও অনেকটা তেমনি। 

আমার ব্যক্তিগত ধারণায় যে কোনো লিঙ্গের একজন পোড় খাওয়া লেখকের মনোজগৎ নারী এবং পুরুষের মন ও হৃদয়ের সম্মিলিত সমাহার। তিনি নিজে কী লিঙ্গ, সেটি বড় কথা নয়। মানুষের জীবনকে লেখক কীভাবে অবলোকন করেন, কীভাবে সমাজের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেটা মিলিয়ে দেখেন, তারপর কীভাবে তা নিজের রচনায় ব্যবহার করেন বা করতে পারেন, সেটি হচ্ছে বড় কথা। এ ব্যাপারে যার যত মুনশিয়ানা তিনি তত বেশি করে পাঠকের কাছে যেতে পারেন বলে আমি ধারণা করি।

এই যে প্রতিদিন আমরা রাস্তাঘাটে চলাফেরা করি, প্রতিদিন নানারকমের মানুষের সঙ্গে আমাদের ওঠাবসা হয়, যার ভেতরে পুরুষই বেশি, সেখানে প্রতিনিয়ত তাদের হাবভাব, চলাফেরা আমি যদি লেখক হই আমাকে সচেতন করে, আমাকে ভাবায়, তাদের কথাবার্তার ভেতরে আমি ছেঁকে তুলি তাদের মনোজগতের না বলা অনেকই কথা, সেগুলোও আমাকে আমার নিজের লেখায় হয়তো প্রভাবিত করে। 

তবে এটাও হয়তো কোনো কথা নয়। সত্যিকার লেখকের সে নারী হোক বা পুরুষ, তাদের মনের ভেতরে একটি বিশেষ ধরনের দেখার দৃষ্টি অবশ্যই থাকে। তা যদি না থাকত তো পর্দার আড়ালে থেকেও রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন পুরুষের চরিত্রের বিশ্লেষণ এমন নিপুণভাবে করতে পারতেন না!

তবে হ্যাঁ, নারী লেখকের ক্ষেত্রে অনেক সময় পুরুষ চরিত্র আঁকতে কিছু বাধা মনে হয় অবশ্য আছে। আর সেটা হলো সাহিত্যের অঙ্গনে গালিগালাজ। বহু পুরুষ লেখক অনায়াসে গল্প বা উপন্যাসে নিকৃষ্ট সব গালিগালাজ জীবন বাস্তবতার চিত্র হিসেবে পুরুষ চরিত্রের মুখে তুলে আনতে পারেন। এমন সব গালিগালাজ, যা পড়লে নারীদের অনেক সময় বিবমিষা হয়। নারী লেখকদেরও হয়। এ কারণে নারী লেখকদের বাস্তবধর্মী গল্প বা উপন্যাসেও পুরুষ চরিত্রের মুখে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে দেখি না। তারা অনেকটা গ্রহণযোগ্য পরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করেন। তবে কালের গতিকে স্বীকার করে নিয়ে হয়তো একদিন নারীদের লেখাতেও এ ধরনের অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ দেখা যাবে। কারণ গল্প বা উপন্যাস আমরা যাই লিখি না কেন, বস্তুত তা মানবজীবনেরই প্রতিফলন। তবে সেই তথাকথিত অশ্লীল বাক্যাবলিকে সাহিত্যের পরিমণ্ডলে একমাত্র ধারণ করতে পারেন শক্তিশালী গল্প বা উপন্যাস লেখক। যেমন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

অবশ্য অনেকেই বলে থাকেন সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা বলে কিছু নেই।

নারীদের কবিতার ভেতরেও এর প্রতিফলন পাই।

আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রাথমিক অবস্থায় মুসলিম যেসব পুরুষ ঔপন্যাসিক ছিলেন, তাদের অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে নারী চরিত্র আঁকতে হতো। কারণ তখন অভিজাত ঘরের মুসলিম নারীরা ছিলেন পর্দার আড়ালে। তারা যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন, তাদের শরীরের বাইরে শুধু জুতো পরা পা দুটোই দেখা যেত। সুতরাং সেই সময় একজন মুসলিম লেখককে মুসলিম নারী চরিত্র আঁকতে হিমশিম খেতে হতো। নারী চোখে না দেখলে নারী চরিত্র আঁকবেন কী করে? তখন তাদের দৃষ্টি ফেলতে হতো নিজেদের সংসারের খালাতো চাচাতো মামাতো ফুপাতো বোনদের ওপরে। যাদের সংসারে এগুলো নেই, তাদের কপাল পোড়া। সাহিত্যিক হওয়া একটা বাতাসে ফানুস দোলানোর মতো।

শুনেছি একবার একজন মুসলিম সাহিত্যিক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন মুসলিম নারীর পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হাঁটতে গিয়ে সেই পর্দানশিন নারীর শাড়ি গোড়ালি থেকে সামান্য উঠে যাওয়াতে তিনি সেই নারীর পায়ের লোম বা রোম দেখলেন। মনে হয় সেই নারীর রং ছিল ফর্সা। সুতরাং রোমের চেহারা ছিল সোনালি। এতে করে তিনি একটি গল্পের প্লট পেলেন। এবং সেই প্লট অবলম্বন করে ছোট একটি গল্প লিখলেন।

গল্পটি লেখার সময় তিনি মনের ভেতরে কল্পনার ফানুস উড়িয়ে দিলেন। নারীর পায়ের রোম সেই গল্পের মূল উপজীব্য হয়ে থাকল।

গল্পটি হলো অবশেষে রোমান্টিক একটি প্রেমের গল্প। কলকাতার কোনো পত্রিকায় সেই গল্পটি ছাপা হলো। মুসলিম লেখকরা গল্পের প্রশংসা করলেন। লেখকও খুব খুশি হলেন।

তার পরের মাসে কলকাতার শনিবারের চিঠি বা এমনি কোনো কট্টর পত্রিকায় তাঁর গল্পটির সমালোচনা বের হলো। যার একটি লাইন ছিল এরকমের– ‘পায়ের রোম দেখেই এত, বার্লিন দেখলে না জানি কী হতো!’ 

তো বাঙালি লেখকরা গত শতাব্দীতে যেসব উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন, তারা কত কষ্ট করেই না কল্পনা করে মানব-মানবীর জীবনের গল্প লিখেছেন। কখনও নদীর তীরে নায়কের কোরান তেলাওয়াত শুনে, কখনওবা মেয়েদের পায়ের রোম দেখে তাদের নায়ক-নায়িকারা প্রেমে পড়েছেন।

কিন্তু মজার কথা হলো, তারা যখন লিখেছেন তখনও যেমন তাদের গল্প, উপন্যাস মানুষের মন জয় করেছে, লাখ লাখ মানুষ সেই গল্প বা বই পড়েছে, হয়তো এখনও তেমনি পড়ছে।

তারপরও আমার লেখক হিসেবে একটা জবাবদিহি থেকে যাচ্ছে।

একজন মেয়ে লেখক কীভাবে তাঁর সাহিত্যে পুরুষের মনোজগৎ আঁকেন?  

মেয়েরা গল্প বা উপন্যাসে পুরুষ চরিত্র আঁকতে গেলে তাদের মনের মধ্যে একটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবের উদয় হয়। যে চরিত্র তারা আঁকেন বা আঁকতে চান, তার একটি রূপরেখা মনের ভেতরে নিজের অজান্তেই আস্তানা গেঁড়ে বসে যায়। সমাজের চারদিকে যেসব পুরুষ তারা নিয়মিত দেখেন, তাদের কথা শোনেন বা আলাপ করেন, সবাই একজন নারী লেখকের মনোজগতে আশ্রয় নিয়ে বসে থাকে! এগুলো হয় তাদের স্টিমুলাস। এগুলো তাদের মনের কুঠুরিতে জমা হয়ে থাকে। যখন যাকে তাঁর লেখায় প্রয়োজন হয়, তখন তিনি তাকে তাঁর উপন্যাস বা গল্পে ব্যবহার করেন। এটা মনে রাখতে হবে মনের ভেতরে যে ধারণা একজন লেখকের গড়ে ওঠে, তার সূচনা বস্তুত অনেক আগে থেকেই ভেতরে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। এমনকি কাল্পনিক কোনো পুরুষের চরিত্রকেও একজন প্রতিষ্ঠিত নারী লেখক অনায়াসে তাঁর গল্প বা উপন্যাসে তুলে আনতে পারেন। 

এবং আমার ধারণা পুরুষ লেখকের জন্যও এটা সত্য। কারণ লেখক মাত্রই আমার ধারণায় তাদের মনোজগতে তারা ইউনিসেক্স। তারা নারী এবং পুরুষ উভয়ের মনোজগৎকে সুন্দরভাবে চোখের সমুখে বিছিয়ে রেখে তাদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারেন। এবং আমার এই ধারণা শুধু বাংলাদেশের লেখককুল নয়, পৃথিবীর যাবতীয় লেখকের জন্য কিছুটা হলেও সত্য।

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *