নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, নিষ্প্রাণ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স

by | ফেব্রু ২৯, ২০২৪ | সমকাল অনুসন্ধান | ০ comments

নরসিংদীর বেলাবতে ২০১৭ সালে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ‘উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স’। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক যোগাযোগের সমন্বয়ই ছিল এর লক্ষ্য। সেই কমপ্লেক্স চার বছর ধরে পড়ে আছে। তিন তলা ভবনের প্রতি তলায় ধুলাবালির আস্তর পড়েছে। শাটারগুলোতে ধরেছে মরিচা। শৌচাগার ও জেনারেটর নষ্ট। নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা। ভূতুড়ে পরিবেশ। মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভবনের দোকানঘর ভাড়া দেওয়ার কথা থাকলেও আগ্রহ নেই কারও। 

উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা আ. খালেক মাস্টার সমকালকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচিত কমিটি নেই। কমিটি থাকলে এমনটা হতো না।’ শুধু বেলাব মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সই নয়, সারাদেশে দেড় শতাধিক কমপ্লেক্স এমন নিষ্প্রাণ। আবার যেসব কমপ্লেক্স মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, সেগুলোতেও মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব প্রকট। ২০১৭ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের নির্বাচন না হওয়াই এর কারণ। 

বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন। অধিকাংশ উপজেলা কমপ্লেক্সে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তত দুটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। একটি অংশের নেতৃত্ব দেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বা ইউএনও মনোনীত প্রতিনিধি। তারা সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিসহ নানা ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাদের পারস্পরিক সোহার্দ্য-সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। অনেক এলাকায় বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। 

সমকালের অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের নির্বাচন না হওয়ার কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বর্তমানে নেতৃত্বশূন্য। এই সংসদ ভাতা থেকে শুরু করে, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইসহ সব কাজের সমন্বয় করে। ২০১৭ সালের ৮ জুন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচিত কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। ওই বছরই কেন্দ্রীয় সংসদ পরিচালনায় একজন অতিরিক্ত সচিব, জেলা পর্যায়ে ডিসি এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। গত বছর নির্মাণ শেষ হওয়া উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা হয়। এর পর থেকে কমপ্লেক্সের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে সংসদের বিগত কমিটির নেতাদের বিভেদ প্রকট হয়ে ওঠে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা নেতৃত্ব তাদের হাতেই রাখার পক্ষে। ২০০১ সালে প্রণীত গঠনতন্ত্র অনুসারে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তত্ত্বাবধান করে। 

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সর্বশেষ চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম সমকালকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছয় বছর ধরে সরকারি আমলা অর্থাৎ প্রশাসক দিয়ে চলছে। তারা বাপের বয়সী মুক্তিযোদ্ধদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন– এটি চরম অপমানজনক। তাদের কাছে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ধরনা দিতে হয়। এর জন্য মন্ত্রণালয় ও জামুকা (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) দায়ী। আমরা বরাবরই নির্বাচনের জন্য মন্ত্রণালয়কে চাপ দিয়ে আসছি। কয়েক দফা তপশিল ঘোষণার পরেও নির্বাচন হয়নি।’

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুল আহাদ চৌধুরী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা নেতৃত্বে না থাকায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে শুরু করে উপজেলা কমপ্লেক্স– সর্বত্রই বিভেদ সৃষ্টি হচ্ছে। এ সুযোগে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইসহ সব ক্ষেত্রে আমলারা প্রভাব বিস্তার করছেন।’ 

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সাংগঠনিক কমান্ডার সৈয়দ আলী গাজি সমকালকে বলেন, ‘উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি গ্রুপ। নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ৪০ থেকে ৪৫ জন কমপ্লেক্সে আসেন না। নির্বাচনই এর সমাধান।’ 

জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদে প্রশাসক নিয়োগ করায় সাবেক নেতারা তাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব অব্যাহত রাখতে কয়েক বছরে অন্তত ৮ থেকে ১০টি সংগঠনের সৃষ্টি করেছেন। সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা কমিটিও গঠন করেছে।  

দেশে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড, সাতটি মহানগর কমান্ড, ৬৪টি  জেলা ও ৪৭০টি উপজেলা কমান্ড কাউন্সিল রয়েছে। কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থনের মধ্যে ২০১৭ সালের ১২ জুলাই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ‘প্রশাসক’ নিয়োগের আদেশ দেন। ওই বছরের ১৯ জুলাই সংসদ পরিচালনায় পৃথক প্রশাসক নিয়োগ দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেই থেকে সংসদের নেতৃত্বে ডিসি ও ইউএনওরা। আইনি জটিলতার অবসান হলে ২০২১ সালের ১৮ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ সচিকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন দুই দফা তপশিল ঘোষণা করলেও নির্বাচন হয়নি।

জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। তিনি সংগঠনের উপদেষ্টা। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন হওয়া দরকার। উপজেলা কমপ্লেক্স ভবনের দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই থাকুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘কমপ্লেক্সগুলোর অব্যবস্থাপনার বিষয়টি  স্থানীয় প্রশাসনের দেখার কথা। এ বিষয়ে তাদের মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হবে।’ 

কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থা
উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যক্রমে গতি আনতে ২০১২ সালে দেশের ৪৭০টি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এ জন্য খরচ ধরা হয় ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। দুই দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। গত আগস্ট পর্যন্ত ৪৩৬টি কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রতিটি ভবন তিন তলা বিশিষ্ট। ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলা ভাড়া দিয়ে আয় থেকে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দৈনন্দিন ব্যয় এবং ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। আড়াই হাজার বর্গফুটের ভবন নির্মাণে গড়ে খরচ হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একই মডেলে নির্মিত প্রতিটি কমপ্লেক্সে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তিসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে ধরে সকলকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিটি ভবনের প্রবেশমুখের পাশে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি।’ স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন দিবসে এই কমপ্লেক্সে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। মুক্তিযোদ্ধাদের অবর্তমানেও এসব কমপ্লেক্স একইভাবে ব্যবহৃত হবে।

৭৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ 
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলে ১৯৭২  থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৪৬টি খাতে ৭৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। রাজস্ব অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় এ অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ৪০ বছর পূর্তি ও মুজিবনগর দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন খাতে ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা খরচে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদকে) অভিযোগের পরেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ২০১৭ সালে হাইকোর্টে দুটি রিট করেন টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রবিউল আলম। ওই বছরের ১৭ জুন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দুর্নীতির বিষয় তদন্ত করতে দুদককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রিটকারী রবিউল ২০২১ সালে মারা গেছেন। রবিউলের ছেলে ওমর ফারুক বিপ্লব সমকালকে জানান, তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর মামলার বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি।

০ Comments

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *